সারা বিশ্ব আজ শরণার্থী সংকটের মুখোমুখি। সহিংসতা থেকে পালাতে এবং জীবন বাঁচাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন সময় তারা তাদের বাড়িঘর থেকে, দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে বা বিতাড়িত হতে বাধ্য হয়েছে। ইউ এন এইচ সি আর-এর তথ্য অনুযায়ী, এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে দেশহারা শরণার্থী দের সংখ্যা সোয়া আট কোটি। বিভিন্ন সময়ে, এই সোয়া আট কোটি মানুষ নিজের দেশ, পরিবার, প্রিয়জন, ঘরবাড়ি ছেড়ে সম্পূর্ণ অচেনা কোনও দেশে এসে বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছে এবং শরণার্থীর জীবন যাপন করছে। প্রতিদিন নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে বা নতুন কোনো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। ভারতবর্ষেও আশ্রিত রয়েছে প্রায় দুই লক্ষ শরণার্থী। প্রতিদিন এই শরণার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা, নিরাপত্তার দায় এখন ভারত সরকারের। এই শরণার্থীরা বিভিন্ন সময়ে মায়ানমার, তিব্বত, বাংলাদেশ, আফগানিস্থান, শ্রীলংকা থেকে ভারতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। সম্প্রতি আমরা দেখেছি আফগানিস্থান থেকেও বহু মানুষ এসে আশ্রয় নিয়েছে ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষও তাদের ‘অতিথি দেব ভব’ অর্থাৎ অতিথি ঈশ্বরের মতোই হিসেবে গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘের ‘ইউএনএইচসিআর’ পৃথিবীর শরণার্থীদের অধিকার এবং সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে বিশ্বব্যাপী। ভাবলে অবাক লাগে এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে প্রায় সোয়া আট কোটি গৃহহারা, জন্মভিটেহীন মানুষ রয়েছে। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা শরণার্থীদের সংকট, তাদের অধিকার এবং তাদের সুরক্ষা এবং আত্মনির্ভর করে তোলার জন্যে জাতিসংঘের, ইউনাইটেড নেশানের ‘শরণার্থী হাই কমিশন’-এর ভুমিকা কি এইসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (UNITED NATIONS HIGH COMMISSIONER FOR REFUGEES/UNHCR) জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন সংক্ষেপে UNHCR জাতিসংঘের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। যার দায়িত্ব হচ্ছে জাতিসংঘ বা কোন দেশের সরকারের অনুরোধে স্বদেশশহীন, বাস্তুহারা, স্বদেশ থেকে বিতাড়িত, মাত্রিভুমিচ্যূত শরণার্থীদের রক্ষা করা। তাদের অবস্থার পাশে দাড়ানো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে, এবং নিজ দেশে ফেরা পর্যন্ত যথোপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যাবস্থা করা। এই সংস্থা ১৯৫০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইউ এন এইচ সি আর- এই নিয়ে দুইবার নোবেল শান্তি পুরষ্কার লাভ করেছে ১৯৫৪ সালে এবং ১৯৮১ সালে। ইউ এন এইচ সি আর- এর হাই কমিশন বলেছে, যে দেশ গুলি শরণার্থীদের অধিকারকে সম্মান করে এবং স্বাগতিক দেশ তার সুরক্ষা দেয়। ইউ এন এইচ সি আর-এর ১৯৫১ সালের কনভেনশন অনুসারে বলা হয়েছে, কোনও একজন শরণার্থীকে এমন একটি দেশে ফেরানো উচিৎ নয়, যে দেশে তাদের জীবন বা বেঁচে থাকার স্বাধীনতা গুরুতর হুমকির সম্মুখীন। পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে ঘটনা গুলি দেখে আমরা দেখেছি, মূলত যে শরণার্থী সংকটের শিকার হয়েছে প্রধানত কোন দেশের সংখ্যালঘু জনগণ। যেকোনো দেশের সংখ্যালঘু বা পিছিয়ে পড়া মানুষের ক্ষেত্রেই এই সংকট সবচেয়ে বেশী ঘটে। সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মানুষ কিন্তু নিরাপদেই থাকে। যাইহোক, আফগানিস্থানে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ এবং ভয়ংকর উচ্ছেদের ছবি দেখার পরে আমাদের সেই মিথও কিন্তু ভেঙ্গে গেছে। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শরণার্থীদের অধিকার এবং তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার সাথে জড়িত বিভিন্ন ইস্যুগুলি সম্পর্কে পরিচিত হওয়া এবং তাদের বোঝার চেষ্টা করা আমাদের সবার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। মূলত, শরণার্থীদের নাগরিক হিসাবে তাদের অধিকারকে নিশ্চিত করা, তাদের কল্যাণে যাবতীয় সহায়তা প্রদান এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনার গ্রহণের মধ্যে দিয়ে তাদের নিরাপত্তা দেয়াই ইউ এন এইচ সি আর-এর কাজ যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা আইনত তাদের স্বাগতিক দেশে বা হোস্ট কান্ট্রিতে থাকছে। শরণার্থী কারা? আমরা সাধারণত এই শরণার্থীদের চিহ্নিত করতে গিয়েই সবচেয়ে বেশী সমস্যায় পরি। সবাই কিন্তু শরণার্থী নয়। জেনে নেয়া যাক শরণার্থীদের সম্পর্কে। ১) আশ্রয়প্রার্থী বা (Asylum Seeker) যখন একজন ব্যাক্তিকে তার জীবন বা নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন হুমকির কারনে তার নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়, তখন তারা অন্যান্য দেশে, প্রায়শই প্রতিবেশী দেশগুলিতে সুরক্ষা খোঁজে বা আশ্রয় খোঁজে। যদি কোন ব্যাক্তি আইনগতভাবে অন্য দেশে প্রবেশ করে সুরক্ষার জন্যে এবং আশ্রয়ের জন্যে আবেদন করে, সেই ব্যাক্তি হলেন আশ্রয় প্রার্থী বা Asylum Seeker। প্রতিটি আশ্রয়প্রার্থী শেষ পর্যন্ত শরণার্থী হিসাবে স্বীকৃত হবেনা। তবে প্রতিটি স্বীকৃত শরণার্থী প্রাথমিকভাবে একজন আশ্রয়প্রার্থী। ২) অভিবাসী যখন কোনও ব্যাক্তি সীমান্তের ওপারে বা আভ্যন্তরীণভাবে বা অন্য কোন দেশে নিজের ইচ্ছায় চলে যায় তখন তারা অভিবাসী হিসাবে পরিচিত হন। অভিবাসীরা সাধারণত উন্নত শিক্ষা, জীবিকা বা অর্থ উপার্জন বা সাধারনভাবে উন্নত জীবনযাত্রার সন্ধানে তাদের দেশ বা বসতবাড়ি ছেড়ে অন্য কোন দেশে চলে যায়। যে কেউ স্বেচ্ছায় তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল বা দেশ থেকে অন্য কোন উন্নত দেশে যায় তাকে অভিবাসী বলা যেতে পারে। ৩) শরণার্থী শরণার্থী মূলত এমন একজন ব্যক্তি যিনি জীবন এবং নিরাপত্তার হুমকির কারনে তাদের দেশে ফিরে যেতে অক্ষম বা থাকতে পারেন না। এই ভয়ের কারন প্রধানত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বা সামাজিক বৈষম্য এবং শসস্ত্র সংঘাতের কারনেই সৃষ্টি হয়। বৈষম্যের ভিত্তি ধর্ম থেকে শুরু করে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক মতামত পর্যন্ত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বাস্তু বা শরণার্থীদের নিরাপত্তা এবং সমস্ত রকমের সুরক্ষার দায়িত্ব আয়োজক দেশ বা হোস্ট কান্ট্রি এবং সেই দেশের সরকারের উপর বর্তায়। কখনোই অন্য কোন দেশ থেকে চলে আসা শরণার্থীদের, তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করা উচিৎ নয় বা করতে পারেন না। আশ্রয় দেয়া দেশ কারণ সেখানে তাদের জীবন সঙ্কট বা অধিকারগুলি ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে। ৪) অভ্যন্তরীণ ভাবে বাস্ততুচ্যুত ব্যক্তি একজন অভ্যন্তরীণভাবে বাস্ততুচ্যুত ব্যাক্তি এমন একজন ব্যক্তি যিনি তাদের বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন কিন্তু সেই ব্যক্তি তাদের নিজ দেশের সীমানার মধ্যেই থাকেন। যেমনটা হয়েছে ত্রিপুরা রাজ্যে। মিজোরাম থেকে অভ্যন্তরীণ কারনে বিতাড়িত হয়ে অনেক রিয়াং সম্প্রদায়ের মানুষ রাতারাতি আশ্রয় নিয়েছিলেন উত্তর ত্রিপুরার কাঞ্চনপুরে। তারা দীর্ঘ ২২ বছর ধরে ত্রিপুরাতেই আশ্রিত ছিলেন। সম্প্রতি ভারত সরকারের উদ্যোগে তাদের পুনর্বাসনের ব্যাবস্থা করা হয়। বিশ্বে আট কোটিরও বেশী শরণার্থী রয়েছেন। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশী শরণার্থী আফগানিস্থান, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের। আজকের দিনে ইউএনএইচসিআর- এই শরণার্থীদের সুরক্ষা, শরণার্থী স্ট্যাটাস, স্বনির্ভর করে তোলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী কাজ করে চলেছে। প্রতিদিন পাল্টাচ্ছে পৃথিবীর অবস্থা। আর বছরের পর বছর ধরে কিছু মানুষ এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। এই বিষয়ে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা দরকার। এবং সবার উচিৎ শরণার্থীদের জীবন, সুরক্ষা এবং কাজের অধিকারকে নিয়ে জনমত গড়ে তোলা। কারণ তারা অসহায় সর্বস্বান্ত এবং দেশহারা। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ UNITED NATIONS HIGH COMMISSIONER FOR REFUGEES/UNHCR ছবি সৌজন্যেঃ Getty Images