ভূমিকা আর্থিক দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া নাগরিকদের আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে টেনে আনার লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার ২৮ আগস্ট ২০১৪ নতুন দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রাসঙ্গিক কথা আর্থিক দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষজনকে আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা ধরেই শুরু হয়েছে। কিন্তু তেমন ভাবে সমাজের প্রত্যন্ত স্তরে পৌঁছনো সম্ভব হয়নি। ২০০৫ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া প্রথম এ ধরনের মানুষজনকে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যাপারে আকৃষ্ট করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কেওয়াইসি সংক্রান্ত নিয়ম খানিকটা শিথিল করে ‘জিরো ব্যালান্স’ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সুবিধা দেওয়া হয়। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার এই আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে প্রতিটি বাড়িতে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ১৫ আগস্ট লালকেল্লার ভাষণে পিছিয়ে পড়া ব্যক্তিদের আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে আনার জাতীয় মিশন—‘প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার’ কথা ঘোষণা করেন। এই প্রকল্পের ৬টি মূল স্তম্ভ রয়েছে। প্রথম বছর চারটি স্তম্ভ রূপায়িত হবে। এর মধ্যে আছে— ১) প্রত্যেকের জন্য ব্যাঙ্কিং পরিষেবা উন্মুক্ত করা। ২) আর্থিক সাক্ষরতার কর্মসূচি গ্রহণ। ৩) ওভারড্রাফটের সুবিধা এবং ‘রূপে’ ডেবিট কার্ডের সুবিধা সহ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ। ৪) প্রাথমিক স্তরের ক্রেডিট গ্যারান্টি তহবিল গঠন। প্রস্তুতি এই যোজনার অঙ্গ হিসাবে ব্যাঙ্কগুলি কিছুদিন আগে থেকেই প্রস্তুতি শিবির শুরু করেছে। এর মাধ্যমে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই এমন বাড়িতে অ্যাকাউন্ট খোলার কাজ ও ডেবিট কার্ড বিতরণের কাজ শুরু হয়েছে। দেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল শ্রেণির মধ্যে আর্থিক সাক্ষরতা প্রসারের কাজও শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার প্রয়োজন মেটাতে ৫০ হাজার ব্যবসা সহায়ক নিয়োজিত হবেন। এঁরা ব্যাঙ্কিং পরিষেবার আওতাভুক্ত হননি এমন ৭কোটি বাড়িতে পৌঁছবেন। নতুন গ্রহকদের জন্য সহজ পদ্ধতিতে অ্যাকাউন্ট খোলা হবে এবং প্রত্যেক গ্রাহকই ‘রূপে’ ডেবিট কার্ড পাবেন। গ্রাহকরা এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত দুর্ঘটনা বিমার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি তাঁরা ওভারড্রাফট নেওয়ার সুযোগও গ্রহণ করতে পারবেন। দেশের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী দেশের ২৪ কোটি ৬৭ লক্ষ বাড়ির মধ্যে ১৪ কোটি ৪৮ লক্ষ বাড়ি ব্যাঙ্কিং পরিষেবার আওতায় এসেছে। ১৬ কোটি ৭৮ লক্ষ গ্রামীণ বাড়ির মধ্যে ৯ কোটি ১৪ লক্ষ বাড়িই পরিষেবার আওতায় এসেছে। ৭ কোটি ৮৯ লক্ষ শহরের বাড়ির মধ্যে ৫ কোটি ৩৪ লক্ষ বাড়িই ব্যাঙ্কিং পরিষেবার আওতায় এসেছে। ২০১১ সালে ব্যাঙ্কগুলি ২ হাজার জনসংখ্যা রয়েছে এমন ৭৪হাজার গ্রামে ‘স্বভিমান’ প্রচারের মাধ্যমে পরিষেবা ছড়িয়ে দিয়েছে। দেশের বর্তমান ব্যাঙ্ক নেটওয়ার্ক (৩১ মার্চ ২০১৪ পর্যন্ত) অনুযায়ী মোট ১১৫০৮২টি ব্যাঙ্ক শাখা রয়েছে। এটিএম আছে ১৬০০৫৫টি। এর মধ্যে ৪৩৯৬২টি শাখা (৩৮.২ শতাংশ) এবং ২৩৩৩৪টি এটিএম গ্রামীণ এলাকায়। এ ছাড়াও গ্রামীণ ব্যাঙ্ক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির ১.৪ লক্ষ ব্যবসা প্রতিনিধি গ্রামীণ এলাকায় কর্মরত। ব্যবসা প্রতিনিধিরা ব্যাঙ্কের সাধারণ পরিষেবাগুলি গ্রামে ছড়িয়ে দেন। বেসিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা, টাকা জমা দেওয়া, টাকা তোলা, তহবিল ট্রান্সফার, হিসাব দেখা, মিনি, স্টেটমেন্ট তৈরি প্রভৃতি ব্যাপারে এঁরা সহায়তা করেন। ৩১ মে ২০১৪-র হিসাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে ৯ কোটি ১৭ লক্ষ বাড়িতে পরিষেবা নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৫ কোটি ২৩ লক্ষ বাড়িতে তারা ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছে। গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলিকে ৩ কোটি ৯৭ লক্ষ বাড়ির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা ইতিমধ্যেই ১ কোটি ৯৯ লক্ষ বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছে। কী করতে হবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এবং গ্রামীণ ব্যাঙ্ক মিলিয়ে এখনও ৫ কোটি ৯২ লক্ষ গ্রামীণ বাড়ি ব্যাঙ্কের আওতার বাইরে রয়েছে। মোটামুটি হিসাব অনুযায়ী ৬ কোটি গ্রামীণ বাড়িতে পৌঁছনো প্রয়োজন। প্রতি পরিবার পিছু দু’টি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে, একটি স্বামীর অন্যটি স্ত্রীর— এই হিসাব ধরলে গ্রামে এখনও ১২ কোটি অ্যাকাউন্ট খোলা বাকি। শহরাঞ্চলেও কিছু বাড়িতে এখনও ব্যাঙ্ক পরিষেবা পৌঁছয়নি। জনগণনা অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে ২ কোটি ৫৫ লক্ষ বাড়ি ব্যাঙ্কের আওতার বাইরে আছে। মোটামুটি হিসাব অনুযায়ী শহরাঞ্চলে প্রায় ৩ কোটি অ্যাকাউন্ট খোলার কাজ বাকি আছে। যে সব বাড়িতে ব্যাঙ্ক পৌঁছেছে সেখানেও বহুস্থানে কেবলমাত্র একটি করে অ্যাকাউন্ট হয়েছে। কিন্তু সেই সব জায়গাতেও একটি স্বামীর ও একটি স্ত্রীর ধরে বাড়ি পিছু দু’টি করে অ্যাকাউন্ট করা দরকার। বর্তমান পরিকল্পনা আগের আর্থিক বৃদ্ধির পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনার সঙ্গে এ বারের পরিকল্পনার তিনটি বড় ফারাক রয়েছে। ক) আগের পরিকল্পনায় অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে গ্রামকে ইউনিট ধরা হয়েছিল। এ বার প্রতিটি বাড়িকে ইউনিট ধরা হয়েছে। খ) আগে কেবলমাত্র গ্রামীণ এলাকায় জোর দেওয়া হয়েছিল। এ বার শহর ও গ্রাম- দু’টির উপরই জোর দেওয়া হয়েছে। গ) বর্তমান পরিকল্পনা ‘মিশন’ হিসাবে গণ্য করে রূপায়ণ করার কাজ চলছে। এই মিশনে সর্বত্র পৌঁছনোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। ছ’টি স্তম্ভের মাধ্যমে দু’টি পর্যায়ে মিশন পরিপূর্ণ করা হবে। প্রথম পর্যায় ব্যাঙ্ক সুবিধার সর্বত্র প্রসার। বেসিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা। এই অ্যাকাউন্টগুলিতে ৫ হাজার টাকা অবধি ওভারড্রাফট নেওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রত্যেককে ‘রূপে’ ডেবিট কার্ড দেওয়া হবে। কার্ড পিছু এক লক্ষ টাকা দুর্ঘটনা বিমা করা থাকবে। ‘ডিফল্ট’ অ্যাকাউন্টগুলির জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টি ফান্ড খোলা হবে। দ্বিতীয় পর্যায় ক্ষুদ্র বিমার সুযোগ প্রদান। ‘স্বাবলম্বনের’ মতো অসংগঠিত ক্ষেত্রের পেনশন পরিকল্পনা। দ্বিতীয় পর্যায়ে পাহাড়ি এলাকা, আদিবাসী অধ্যুষিত দুর্গম এলাকায় পৌঁছনো হবে। প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ও ছাত্রকে পরিকল্পনার মধ্যে আনা হবে। সুত্রঃ পোর্টাল কনটেন্ট টিম